Pages

▼
▼

যবানের হেফাযত বেহেশতের যামানত,


বাকশক্তি আল্লাহ তাআলার বড় নিআমত ও মহা দান। বান্দার বহুবিধ কল্যাণ এতে নিহিত। বহুমুখী প্রয়োজন পূরণের লক্ষ্যে তিনি এ নিআমত বান্দাকে দান করেছেন। অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দিয়ে এসব প্রয়োজন পূরণ করা সম্ভব নয়। যবানের নিআমত থেকে বঞ্চিত হলে অন্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ এর প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। কোনো কিছুই যবানের বিকল্প হতে পারে না। মানুষের মনের ভাব, দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-বেদনা, আনন্দ-উল্লাস প্রকাশে যবান অগ্রণী ভ‚মিকা পালন করে। বলতে গেলে যবান সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মুখপাত্র। বোবার মনের কত দুঃখ-কষ্ট, কত আনন্দ-বেদনা, কিন্তু কাউকে জানাতে পারে না, জীবনের প্রতিটি ধাপে যার বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। যে বাকশক্তি হারিয়েছে সে-ই উপলদ্ধি করতে পারে- যবান কত বড় নিআমত! সাধারণত যার মুখে জড়তা আছে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে কথা বলতে পারে না তার জীবনেই তো কত সমস্যা। কত কষ্ট পেতে হয় তাকে। কত জায়গায় লজ্জা পেতে হয়। অথচ আমরা নির্বিচারে যত্রতত্র যবানের অপব্যবহার করে চলেছি। বস্তুত এত বড় নিআমতের উপলদ্ধি আমাদের মাঝে না থাকার কারণ হল, বিনামূল্যে কোনো কষ্ট স্বীকার ছাড়াই এ নিআমত আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দান করেছেন। হায়! আমরা যদি একটু বুঝতাম, কত দামী এ নিআমত! রব্বে কারীমের কত বড় দান! একটু ভেবেছি কি- কীভাবে কথা বলছি? এত সুন্দর আওয়াজ কীভাবে বের হয়? কোথা থেকে এ ধ্বনিগুলো উচ্চারিত হয়? আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কত বড় নিআমত দান করেছেন আর আমরা তাঁর নাফরমানিতে লিপ্ত। এ যবানের কত অপব্যবহার করছি হিসাবও নেই। কত পাপ এ যবান দিয়ে হচ্ছে, আমাদের অনুভূতিও নেই। একটু ভেবেছি কি, কথা বলার জন্য যদি মিনিট হিসাব করে বিল পরিশোধ করতে হত, তাহলে জীবনটা কত দুর্বিষহ হত। আল্লাহ আমাদের এই নিআমত এমনিতেই দিয়ে দিয়েছেন। কথা বলতে কোনো কষ্টও পোহাতে হয় না। তাই অনেক বেশি শুকরিয়া আদায় করা প্রয়োজন। অথচ আমরা নির্বিচারে যবানের প্রতি জুলুম করে যাচ্ছি। নাফরমানির কাজে ব্যবহার করছি। এ যবান দিয়ে খালেকের বিরুদ্ধাচরণ করছি। এমনকি শিরকী-কুফরী কথাও যারা বলছে এই যবান ব্যবহার করেই বলছে। অনুভ‚তি-অনুশোচনাও নেই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
إِنّ العَبْدَ لَيَتَكَلّمُ بِالكَلِمَةِ، مَا يَتَبَيّنُ فِيهَا، يَزِلّ بِهَا فِي النّارِ أَبْعَدَ مِمّا بَيْنَ المَشْرِقِ.
অর্থাৎ বান্দা চিন্তা-ভাবনা ছাড়া এমন কথা বলে ফেলে, যার কারণে সে (পূর্ব-পশ্চিমের দূরত্ব পরিমাণ) জাহান্নামের অতলে নিক্ষিপ্ত হবে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৪৭৭
বহু ক্ষেত্রে যবানের অপব্যবহার গভীর সম্পর্ককেও তছনছ করে দেয়। নিবিড় বন্ধুত্বের মাঝেও ফাটল ধরায়। দীর্ঘদিনের আত্মীয়তাকে মুহূর্তে শেষ করে দেয়। হৃদয়কে জর্জরিত করে। অন্তরকে ক্ষত বিক্ষত করে, যা কখনও মানুষ ভুলতে পারে না। কারণ, যবানের আঘাতের ঘা শুকায় না। কবি বলেছেন-
جراحات السنان لها التيام + ولا يلتام ما جرح اللسان
বর্শার ফলার আঘাতের উপশম হয়। তবে যবানের আঘাতের কোনো উপশম নেই।
যবানের সঠিক ব্যবহার যেমন প্রভ‚ত কল্যাণ বয়ে আনে তেমনি এর অপব্যবহার ধ্বংস ডেকে আনে। এজন্যে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতের যবানের ব্যবহার নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন হতেন।
عَنْ سُفْيَانَ بْنِ عَبْدِ اللهِ الثّقَفِيِّ، قَالَ: ... قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، مَا أَخْوَفُ مَا تَخَافُ عَلَيّ؟ قَالَ: فَأَخَذَ بِلِسَانِ نَفْسِهِ، ثُمّ قَالَ: " هَذَا ". হযরত সুফিয়ান ইবনে আব্দুল্লাহ আসসাকাফী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ...আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম, আমার কোন্ বিষয়ে আপনি সবচেয়ে বেশি আশংকা করেন। তখন তিনি নিজ জিহ্বা ধরলেন এরপর বললেন, এটা। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৫৪১৯
যবান খুব দামী নিআমত। সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাঝে যবানের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। পরস্পরিক কথাবার্তা, লেনদেন, আলাপ-আলোচনা, সব কিছুতেই মুখের ভ‚মিকা অপরিসীম। এটা সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রতিনিধি ও মুখপাত্র। যবানের যথাযথ ব্যবহারের দ্বারা দুনিয়া-আখেরাতে মানুষ যেভাবে উপকৃত হতে পারে তদ্রূপ এর অপব্যবহার দ্বারা ডেকে আনতে পারে ধ্বংস। এই যবান যেমন সত্তর বছরের বৃদ্ধকে ঈমানের স্বীকারোক্তি দ্বারা জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেয় তেমনি কুফরের উচ্চারণ দ্বারা তা মানুষকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করে। যার বাকশক্তি মজবুত এবং যে সুন্দর উপস্থাপনে পারঙ্গম যবানের অপব্যবহারে তার ক্ষতির আশংকাও তত বেশি। তাই তো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উম্মতকে সতর্ক করে দিয়েছেন। উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, একবার নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরের দরজায় কিছু মানুষকে বিবাদে লিপ্ত দেখে বললেন-
إِنّمَا أَنَا بَشَرٌ، وَإِنّهُ يَأْتِينِي الْخَصْمُ، فَلَعَلّ بَعْضَهُمْ أَنْ يَكُونَ أَبْلَغَ مِنْ بَعْضٍ، فَأَحْسِبَ أَنّهُ صَادِقٌ، فَأَقْضِيَ لَهُ بِذَلِكَ، فَمَنْ قَضَيْتُ لَهُ بِحَقِّ مُسْلِمٍ فَإِنّمَا هِيَ قِطْعَةٌ مِنَ النّارِ فَلْيَأْخُذْهَا أَوْ لِيَتْرُكْهَا.
আমিও মানুষ। আমার কাছে (বিচার নিয়ে) বাদী-বিবাদী আসে। কখনো এমন হয় যে, তোমাদের একজনের চেয়ে অপরজন দলীল উপস্থাপনে বেশি পারঙ্গম। ফলে (দলীল উপস্থাপন থেকে) আমি কাউকে সত্যবাদী মনে করি আর (সেই ভিত্তিতে) কারো পক্ষে ফয়সালা করি। কখনো যদি এমন ঘটে- আমি অপর মুসলিমের হক কারো জন্য ফয়সালা করে দিলাম তাহলে (শুনে রাখ) তা হবে জাহান্নামের আগুনের একটি টুকরা। (এখন তার ইচ্ছা, চাইলে) সে তা গ্রহণ করুক অথবা তা থেকে নিজেকে রক্ষা করুক। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৭১৮১
প্রাঞ্জল ও স্পষ্ট ভাষা আল্লাহর মহা দান। তেমনি এর সঠিক ও যথার্থ ব্যবহার অত্যাবশ্যক। নতুবা জাহান্নামের আগুনই হবে ঠিকানা।
সাধারণত আমাদের কথা চার ধরনের হয়।
১. পুরো কথাই কল্যাণকর।
২. পুরো কথাই ক্ষতিকর।
৩. যে কথাতে কল্যাণ-অকল্যাণ মিশ্রিত থাকে। 
৪. যে কথাতে দুনিয়া-আখেরাতের লাভ-ক্ষতি কিছুই নেই। অর্থাৎ অনর্থক কথা।
কল্যাণকর কথার ক্ষেত্রে শরয়ী বিধান হল পুরোপুরি জেনেশুনে কথা বলা। অনুমান করে কথাবার্তা বলবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَ لَا تَقْفُ مَا لَیْسَ لَكَ بِهٖ عِلْمٌ  اِنَّ السَّمْعَ وَ الْبَصَرَ وَ الْفُؤَادَ كُلُّ اُولٰٓىِٕكَ كَانَ عَنْهُ مَسْـُٔوْلًا .
যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই তার পিছে পড়ো না। জেনে রেখো, কান, চোখ হৃদয়- এর প্রতিটি সম্পর্কে  (তোমাদেরকে) জিজ্ঞেস করা হবে। -সূরা বনী ইসরাঈল (১৭) : ৩৬
আমাদের অনেকের মাঝেই একটি প্রবণতা খুব লক্ষ করা যায়। আমরা যা শুনি তাই বিশ্বাস করি এবং প্রচার করতে শুরু করি। যাচাই বাছাইয়ের প্রয়োজন বোধ করি না। কোনো তথ্য বা সংবাদ বর্ণনা করার আগে যাচাই-বাছাই করা কর্তব্য। অন্যথায় মিথ্যা হওয়ার প্রবল আশংকা থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ
ব্যক্তি যা শুনে তা বর্ণনা করা মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট। -সহীহ মুসলিম, হাদীস ৪
যাচাই-বাছাই ছাড়া কথা বলতে থাকা কিংবা সে অনুযায়ী কর্মনীতি নির্ধারণ করতে থাকা চরম বোকামী। পরিণামে তা আক্ষেপের কারণ হয় এবং ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনে। মহান আল্লাহ বলেন-
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اِنْ جَآءَكُمْ فَاسِقٌۢ بِنَبَاٍ فَتَبَیَّنُوْۤا اَنْ تُصِیْبُوْا قَوْمًۢا بِجَهَالَةٍ فَتُصْبِحُوْا عَلٰی مَا فَعَلْتُمْ نٰدِمِیْنَ.
হে মুমিনগণ! কোনো ফাসেক যদি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে ভালোভাবে যাচাই করে দেখবে, যাতে তোমরা অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়ের ক্ষতি করে না বস। ফলে নিজেদের কৃতকর্মের কারণে তোমাদেরকে অনুতপ্ত হতে হয়। -সূরা হুজুরাত (৪৯) : ৬
যে কথায় কল্যাণ-অকল্যাণ উভয়টাই রয়েছে, বিশেষ প্রয়োজনে তা বলা যাবে। যেমন, বললে কারো গীবত হয়, না বললে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হয়- এমন কথা।
ক্ষতিকর ও অনর্থক কথা থেকে বেঁচে থাকা আবশ্যক। মুমিন তো ক্ষতিকর কথা বলতেই পারে না। এসব বলে মুমিন কেন জাহান্নামে যাবে? মুমিন তো অনর্থক কথা থেকেও বেঁচে থাকে। এজন্যে আল্লাহ তাআলা মুমিনদের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন-
وَ الَّذِیْنَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُوْنَ.
যারা অহেতুক বিষয় থেকে বিরত থাকে। -সূরা মুমিনূন (২৩) : ৩
বিজ্ঞজনের উক্তি-
في اللسان آفتان عظيمتان، إن خلص من أحدهما لم يخلص من الأخرى، آفة الكلام وآفة السكوت...
‘যবানের দুটি বিপদ। কথার বিপদ ও চুপ থাকার বিপদ! একটি থেকে মুক্তি পেলেও অপরটি থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন।’
কখনো একটি আরেকটির চেয়ে বড় বিপদ হয়ে সামনে আসে। সত্য থেকে যে চুপ থাকে সেও তো অপরাধী। আর যে বাতিল কথা বলে সে আল্লাহর অবাধ্য, শয়তানের মুখপাত্র।
 যবানের হেফাযতের গুরুত্ব
যবান অনেক দামী নিআমত, আল্লাহ তাআলার মহা দান। তাই এর নিয়ন্ত্রণ ও যথাযথ ব্যবহার কাম্য। কথায় আছে, দামী জিনিসের হেফাযত কঠিন। স্বর্ণ-রৌপ্য তো মানুষ যত্রতত্র ফেলে রাখে না। সাধ্যের সবটুকু দিয়ে হেফাযতের চেষ্টা করে। আল্লাহ তাআলা যবান হেফাযতের তাকীদ করেছেন এভাবে-
مَا یَلْفِظُ مِنْ قَوْلٍ اِلَّا لَدَیْهِ رَقِیْبٌ عَتِیْدٌ.
মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তার জন্য একজন প্রহরী নিযুক্ত আছে, যে (লেখার জন্য) সদা প্রস্তুত। -সূরা ক্বফ (৫০) : ১৮
যবানে উচ্চারিত সবকিছুই ফেরেশতারা সংরক্ষণ করে রাখেন। ভালো-মন্দ, ছোট-বড় সবকিছুই তাঁরা লিপিবদ্ধ করেন। কিয়ামতের দিন এগুলোর হিসাব দিতে হবে। সেইদিন জিহ্বা, হাত-পাসহ সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও সাক্ষী দিবে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
یَّوْمَ تَشْهَدُ عَلَیْهِمْ اَلْسِنَتُهُمْ وَ اَیْدِیْهِمْ وَ اَرْجُلُهُمْ بِمَا كَانُوْا یَعْمَلُوْنَ .
যেদিন তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে তাদের বিরুদ্ধে তাদের জিহ্বা, তাদের হাত ও পা সাক্ষ্য দেবে। -সূরা নূর (২৪) : ২৪
আল্লাহ তাআলা বিভিন্নভাবে বান্দাকে সতর্ক করেছেন-
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوا اتَّقُوا اللهَ وَ قُوْلُوْا قَوْلًا سَدِیْدًا، یُّصْلِحْ لَكُمْ اَعْمَالَكُمْ وَ یَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوْبَكُمْ  وَ مَنْ یُّطِعِ اللهَ وَ رَسُوْلَهٗ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِیْمًا. হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্য-সঠিক কথা বল। তাহলে আল্লাহ তোমাদের কার্যাবলী শুধরে দেবেন এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করল সে মহা সাফল্য অর্জন করল। -সূরা আহযাব (৩৩) : ৭০
আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে তাকওয়া অবলম্বন তথা সব ধরনের নাফরমানী ছেড়ে দিতে বলেছেন। এর  সাথে সাথেই যবানের সদ্ব্যবহার তথা সত্য-সঠিক কথা বলতে বলেছেন। কেননা, যবান হল নাফরমানীর বড় হাতিয়ার। তাই তাকওয়ার সাথেই যবানে সত্য-সঠিক কথা বলতে বলেছেন। যবান ঠিক হয়ে গেলে অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও সংশোধন হয়ে যাবে। তাই এরপরেই সব আমল সংশোধন ও গুনাহ মাফের ঘোষণা দিয়েছেন। আর অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত, যারা যবানের হেফাযত করতে পারে, তারা অন্যান্য গুনাহ থেকে সহজেই বাঁচতে পারে। যবানের ব্যাপারে শিথিলতা অনেক বড় বড় বিপদ ডেকে আনে। দেখা যায়, দু-একটি কথার সূত্র ধরে বউ-শাশুড়ি কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বড় ধরনের ঝগড়া-বিবাদ হয়ে যায়। যবান হেফাযতের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন-
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ.
যে আল্লাহ ও শেষ দিবসে বিশ্বাস রাখে সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬০১৮
একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রিয় সাহাবী ওকবা ইবনে আমের রা.-কে তিনটি ওসিয়ত করলেন। এর প্রথমটি ছিল-
امْلِكْ عَلَيْكَ لِسَانَكَ.
তুমি তোমার জিহ্বাকে নিয়ন্ত্রণে রাখ। -জামে তিরমিযী, হাদীস ২৪০৬  হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন-
وَالّذِي لَا إِلَهَ غَيْرُهُ مَا عَلَى الْأَرْضِ شَيْءٌ أَحْوَجُ إِلَى طُولِ سَجْنٍ مِنْ لِسَانٍ.
অর্থাৎ, সেই সত্তার কসম, যিনি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। ভূপৃষ্ঠে সবকিছুর চেয়ে জিহ্বাই সবচেয়ে বেশি বন্দিত্ব ও  নিয়ন্ত্রণের মুখাপেক্ষী। -আলমুজামুল কাবীর, তবারানী, বর্ণনা ৮৭৪৪; মাজমাউয যাওয়ায়েদ, বর্ণনা ১৮১৮৪
 নবীজী বাচালকে অপছন্দ করেন
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাচালকে অপছন্দ করেন। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে-
وَإِنّ أَبْغَضَكُمْ إِلَيّ وَأَبْعَدَكُمْ مِنِّي مَجْلِسًا يَوْمَ القِيَامَةِ الثّرْثَارُونَ وَالمُتَشَدِّقُونَ وَالمُتَفَيْهِقُونَ
তোমাদের মধ্যে আমার কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় এবং কিয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে দূরে থাকবে সে, যে অযথা বেশি কথা বলে এবং যে অহংকার প্রদর্শনের জন্য, দাপট দেখানোর জন্য মুখ ভরে কথা বলে। -জামে তিরমিযী, হাদীস ২০১৮
 যবানের অপব্যবহারে কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হওয়া
হাদীস শরীফে এসেছে-
خَرَجْتُ وَأَنَا أُرِيدُ أَنْ أُخْبِرَكُمْ بِلَيْلَةِ الْقَدْرِ فَتَلَاحَى رَجُلَانِ فَاخْتُلِجَتْ مِنِّي فَاطْلُبُوهَا فِي الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ فِي سَابِعَةٍ تَبْقَى أَوْ تَاسِعَةٍ تَبْقَى أَوْ خَامِسَةٍ تَبْقَى আমি তোমাদেরকে কদরের রাত সম্পর্কে সংবাদ দিতে বের হয়েছিলাম। কিন্তু দুই ব্যক্তির বিতর্কের কারণে আমি তা ভুলে গেছি। তাই তোমরা শেষ দশকে তা অন্বেষণ কর। তেইশ, একুশ, পঁচিশের রাতে। শবে কদর একটি মহিমান্বিত রজনী। বরকতময় রাত। এ রাতের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে এসেছে-
لَیْلَةُ الْقَدْرِ  خَیْرٌ مِّنْ اَلْفِ شَهْرٍ.
কদরের রাত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। যদি একটু বাগবিতণ্ডার কারণে এত বড় সৌভাগ্য লাভ থেকে বঞ্চিত হতে হয় তাহলে আমরা যেভাবে যবানের অপব্যবহার করি যেমন গীবত, পরনিন্দা অপবাদ, মিথ্যা, কটুকথা, গালি ইত্যাদির কারণে আমরা কত কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি! চুপ থাকতে উৎসাহিত করা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-
مَنْ صَمَتَ نَجَا. যে চুপ থাকে সে বেঁচে যায়। -জামে তিরমিযী, হাদীস ২৫০১
অন্যত্র তিনি বলেন-
إِنّكَ لَمْ تَزَلْ سَالِمًا مَا سَكَتّ، فَإِذَا تَكَلّمتَ كُتِبَ لَكَ أَوْ عَلَيْكَ. তুমি যখন চুপ থাকবে তখন নিরাপদেই থাকবে। আর যখন কথা বলবে তখন তা তোমার পক্ষে কিংবা বিপক্ষে যাবে। -আলমুজামুল কাবীর, তবারানী, হাদীস ১৩৭
এক দার্শনিকের অভিব্যক্তি-
ما إن ندمت على سكوتي مرة ولقد ندمت على الكلام مرارا
আমি কখনো আমার নীরবতার উপর অনুতপ্ত হইনি।  তবে বহুবার কথার কারণে লজ্জিত হয়েছি। তাই আমাদের উচিত চুপ থাকার অভ্যাস গড়ে তোলা। যবানের হেফাযতে বেহেশতের যামানত
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যবান হেফাযতের উপর গুরুত্বারোপ করে বলেন-
مَنْ يَضْمَنْ لِي مَا بَيْنَ لَحْيَيْهِ وَمَا بَيْنَ رِجْلَيْهِ أَضْمَنْ لَهُ الجَنّةَ. যে তার যবান ও লজ্জাস্থান হেফাযতের যামানত দিতে পারবে, আমি তার জান্নাতের যামিন হব। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৪৭৪
 নবীজীর যবানের হেফাযত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য আদর্শ। কথা-বার্তা, চাল-চলন, কাজ-কর্ম সব বিষয়ে তিনি কখনও অযথা অনর্থক কথা বলতেন না, এমনকি বলা পছন্দও করতেন না। শুধু উপকারী ও প্রয়োজনীয় কথা বলতেন। তিনি দীর্ঘসময় নীরব থাকতেন। হাদীসে এসেছে-
كَانَ طَوِيلَ الصّمْتِ قَلِيلَ الضِّحْكِ.
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীর্ঘসময় চুপ থাকতেন এবং কম হাসতেন। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২০৮১০  
সরাসরি মিথ্যা, গালমন্দ, অশ্লীল কথা এগুলো থেকে আমরা অনেকেই বিরত থাকতে চেষ্টা করি। কিন্তু অনেক সময় বেখেয়ালে মিথ্যা বলে ফেলি। যেমন কিছু দেওয়ার বাহানা করে ছোট বাচ্চাকে ডাকা হল অথচ আহ্বানকারীর কাছে দেওয়ার মত কিছুই নেই। এটি মিথ্যার শামিল। উম্মে আবদুল্লাহ ইবনে আমের রা. ছোট বাচ্চাকে কিছু দেওয়ার কথা বলে ডাকছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিষয়টি লক্ষ করলেন। বললেন, তুমি কি তাকে কিছু দেওয়ার জন্য ডাকছ (নাকি কিছু দেওয়ার বাহানা করে তাকে কাছে ডাকছ?)। তিনি বললেন, হাঁ, আমি তাকে খেজুর দেওয়ার জন্য ডাকছি। তখন নবীজী বললেন-
أَمَا إِنّكِ لَوْ لَمْ تُعْطِيهِ شَيْئًا كُتِبَتْ عَلَيْكِ كِذْبَة .
 জেনে রাখ, তুমি যদি তাকে কিছু না দিতে, তাহলে তোমার গুনাহের খাতায় একটি মিথ্যা লেখা হত। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪৯৯১
গল্প-গুজব, হাসি-তামাশা ও রসিকতার ছলে অনেক সময় আমরা অলীক, অবাস্তব ও উদ্ভট কথা বলে ফেলি। এমনকি কখনো কখনো মিথ্যাও হয়ে যায়। এ সমস্যাটি ছোট-বড়, পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে সর্বশ্রেণীর মানুষের মাঝে মহামারির আকার ধারণ করেছে। কারণ রসিকতায় শ্রোতাদের হাসানোই থাকে মুখ্য বিষয়। তাই মিথ্যা, অলীক, অদ্ভুত ও আশ্চর্যজনক কথা বলার প্রবণতা থাকে। এমনকি এসব নিয়ে প্রতিযোগিতা হয়। অথচ মিথ্যাকে আনন্দ-উল্লাসের মাধ্যম বানানো মারাত্মক গুনাহ। এর পরিণাম অনেক ভয়াবহ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
وَيْلٌ لِلّذِي يُحَدِّثُ الْقَوْمَ، ثُمّ يَكْذِبُ لِيُضْحِكَهُمْ وَيْلٌ لَهُ. وَوَيْلٌ لَهُ.
ধ্বংস ওর! যে মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা বলে। ধ্বংস ওর! ধ্বংস ওর জন্য!! -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২০০২১
কারো কারো মাঝে কথায় কথায় লানত-বদদোয়া দেওয়ার অভ্যাস থাকে। বিশেষভাবে নারীদের মাঝে। অনেক সময় তারা আপনজন এমনকি নিজ সন্তানকেও বদদোয়া দিয়ে চলে। হতে পারে তখন দুআ কবুলের মুহূর্ত ছিল। ফলে খাল কেটে কুমির আনার মত অবস্থা হয়। বদদোয়াটা লেগে যায়। এটা খুবই গর্হিত কাজ। যবানের মারাত্মক অপব্যবহার। তাই এ ব্যাপারে আমাদের হুঁশিয়ার থাকা উচিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন-
لاَ تَلاَعَنُوا بِلَعْنَةِ اللهِ، وَلاَ بِغَضَبِهِ، وَلاَ بِالنّارِ.
তোমরা একে অপরকে লানত করো না; বলো না- তোমার উপর আল্লাহর লানত হোক, তোমার উপর আল্লাহর গযব পড়ুক, তুমি জাহান্নামে যাও। -জামে তিরমিযী, হাদীস ১৯৭৬
যবানের অপব্যবহারের আরেকটি ক্ষেত্র হল, ঠাট্টা-বিদ্রূপ, গীবত-অপবাদ ইত্যাদি। আমাদের কারো কারো কথাবার্তার বড় একটা অংশ থাকে তৃতীয় ব্যক্তিকে নিয়ে। হয়ত কারো দোষ চর্চা করা, না হয় কাউকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা অথবা কারো ব্যাপারে মন্দ বলা বা  অপবাদ আরোপ করা। অথচ কুরআন-হাদীস এগুলো থেকে শক্তভাবে বারণ করেছে। এগুলো প্রত্যেকটাই কবীরা গুনাহ। পাশাপাশি যবানের অপব্যবহারেরও শামিল।
 যবানের অপব্যবহারের পরিণাম I যবানের অপব্যবহার মানুষকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। দীর্ঘ এক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, হযরত মুআয রা. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন-
وَهَلْ نُؤَاخَذُ بِمَا تَكَلّمَتْ بِهِ أَلْسِنَتُنَا؟
কথার কারণেও কি আমাদের পাকড়াও করা হবে? (মুখের কথার কারণেও কি জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে?)
তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুআজ রা.-এর উরুতে মৃদু আঘাত করে বললেন-
يَا مُعَاذُ ثَكِلَتْكَ أُمّكَ - أَوْ مَا شَاءَ اللهُ أَنْ يَقُولَ لَهُ مِنْ ذَلِكَ - وَهَلْ يكَب النّاس عَلَى مَنَاخِرِهِمْ فِي جَهَنّمَ إِلّا مَا نَطَقَتْ بِهِ أَلْسِنَتُهُمْ.
فَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَسْكُتْ عَنْ شَرٍّ، قُولُوا خَيْرًا تَغْنَمُوا وَاسْكُتُوا عَنْ شَرٍّ تَسْلَمُوا.
হে মুআয! তুমি এ বিষয়টি বুঝ না! আরে, মানুষকে তো তার যবানের কথাই উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। যে আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাসী সে যেন ভালো কথা বলে বা অন্তত মন্দ কথা থেকে বিরত থাকে। তোমরা ভালো কথা বল, লাভবান হবে। মন্দকাজ থেকে বিরত থাক, নিরাপদ থাকবে। -মুসতাদরাকে হাকেম, হাদীস ৭৭৭৪
 যবানের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যবানের অনিষ্ট থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। কত পুত-পবিত্র তাঁর যবান! যে যবান আল্লাহর তরফ থেকে বান্দার কাছে ওহী পৌঁছায় এবং আল্লাহর কালামের ব্যাখ্যা দান করে। এ যবানের পবিত্রতা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন-
وَ مَا یَنْطِقُ عَنِ الْهَوٰی،  اِنْ هُوَ اِلَّا وَحْیٌ یُّوْحٰی
[সে তার নিজ খেয়াল-খুশি থেকে কিছু বলে না। এ তো ওহী, যা তার কাছে পাঠানো হয়। -সূরা আননায্ম (৫৩) : ৩-৪] তা সত্তে¡ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিনয়কাতর হয়ে আল্লাহ্র কাছে যবানের অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন-
اللّهُمّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ سَمْعِي، وَمِنْ شَرِّ بَصَرِي، وَمِنْ شَرِّ لِسَانِي، وَمِنْ شَرِّ قَلْبِي، وَمِنْ شَرِّ مَنِيِّي.
হে আল্লাহ! আমি আমার কান, চোখ, যবান, হৃদয় এবং লজ্জাস্থানের অনিষ্ট থেকে আপনার আশ্রয় চাই। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ১৫৫১; জামে তিরমিযী, হাদীস ৩৪৯২
আমাদের উচিত যবানের সঠিক ব্যবহারের প্রতি সচেতন ও যত্নবান হওয়া এবং এর অনিষ্ট থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা।

No comments:

Post a Comment